জ়ুবিনের চলে যাওয়ার এক বছর। বিশ্বাস হয় না ওর সঙ্গে এমন কিছু ঘটতে পারে। তবে ও নিজের কাজ ও গানের মধ্যে থেকে যাবে। জ়ুবিনের সঙ্গে আমার ‘মন মানে না’, ‘সোনিয়ে তু’-র মতো গান গাওয়ার অনেক পরে ব্যক্তিগত ভাবে আলাপ। বম্বে গিয়েছিলাম ওর একটি গান রেকর্ড করতে। সে কথা আমার চিরকাল মনে থাকবে। ওকে দেখে অবাক হয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, ‘আজও পৃথিবীতে এমন মানুষ আছে?’
বম্বেতে জ়ুবিনের একটা স্টুডিয়ো ছিল। ওর তৈরি করা গানটি রেকর্ড করতে আমি সেখানে গিয়েছিলাম। সেই দিন ওর এক অন্য রূপ দেখেছিলাম। আন্ধেরিতে নিজের বাংলো ধাঁচের বাড়িতে ওর স্টুডিয়োটা ছিল। গিয়ে দেখলাম, জ়ুবিনের বাড়িটা যেন ‘অসম গেস্টহাউস’! সেই বাড়িতে অনেক লোকজন। জ়ুবিনকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘এরা কারা?’ ও বলেছিল, ও নিজেও জানে না। আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম ওর কথা শুনে। জ়ুবিন বলেছিল, ‘ওদের থাকার জায়গা নেই। টাকাপয়সা নেই। বম্বে এসে কাজ পাওয়ার জন্য লড়াই করছে। এখানেই থাকে ওরা।’
জ়ুবিনের এই রূপটা অনেকেরই অজানা। ওর ওই বাড়িতে যারা থাকত, তাদের থাকা-খাওয়া, সব কিছুর দায়িত্ব নিত জ়ুবিন। আজকের দিনে কে এমন পারে?
অসমের নানা ধরনের রান্না হচ্ছিল সেই দিন। পিকনিকের আবহ ছিল। মাছ-মাংস-সহ নানা কিছু ছিল। আমাকে খেয়ে যেতে বলেছিল। কিন্তু পরের দিন ভোরবেলা আমার ফ্লাইট ছিল। বেশি মশলাদার খাবার আমি এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলাম। তা ছাড়া ভেবেছিলাম, তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়ব। কিন্তু হঠাৎ দেখলাম জ়ুবিন বেরিয়ে গেল। টেবিলে আমার গাড়ির চাবি রাখা ছিল। ওটাও সঙ্গে নিয়ে গেল। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরে ওকে ফোন করলাম। দেখলাম ওর ফোনটাও বন্ধ। এ দিকে আমার গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। অগত্যা আমাকে ওর সহকারীদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে সময় কাটাতে হল। অনেকটা রাত হয়ে যাচ্ছে, তাই খাবারও খেতে হল। নিঃসন্দেহে দারুণ ছিল সেই খাবার। রাত একটা নাগাদ জ়ুবিন ফিরল এবং এসেই আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘খেয়েছ তো?’ বুঝলাম, আমাকে না খাইয়ে ও ছাড়বে না, তাই এমন ফন্দি এঁটে বেরিয়ে গিয়েছিল।
আসলে মন থেকে খুব শিশুসুলভ ছিল জ়ুবিন। কোনও জটিলতা ছিল না ওর মধ্যে। সারল্যে ভরা একটা মানুষ ছিল, যে গান নিয়ে থাকত আর মানুষের জন্য কাজ করত। ওর আন্ধেরির বাড়ির ঘটনা এটা। এমনই অসংখ্য ঘটনা রয়েছে ওর। কত মানুষ যে ওকে বিপদে-আপদে পাশে পেয়েছে, তা গুনে শেষ করা যাবে না। তাই তো ওর চলে যাওয়ায় একটা রাজ্য থমকে গিয়েছিল। জনস্রোত নেমেছিল রাস্তায়। অবশ্যই ও অসাধারণ শিল্পী। তবে ও অসম্ভব ভাল ও জনদরদী মানুষ ছিল বলেই, ওর জন্য নানা প্রান্ত থেকে গুয়াহাটি ছুটে গিয়েছিল মানুষ।
কিন্তু ওর মতো মনের মানুষের এমন পরিণতি হতে পারে, তা কল্পনাও করতে পারি না। ও ব্রহ্মপুত্রের মতো নদে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতার কাটত। তার কী ভাবে এমন হতে পারে জানি না।
ওর সঙ্গে আমার জনপ্রিয় প্লেব্যাক গান ছিল। মঞ্চে একসঙ্গে ডুয়েট আমরা গাইনি। তবে বহু অনুষ্ঠানেই আমাদের পর পর মঞ্চে গাইতে উঠতে হত। আমরা অনুষ্ঠান শুরুর আগে ঠিক করে নিতাম, কে কোন গানটা গাইব, যাতে মিলে না যায়। জ়ুবিনের চেয়ে অনেকটাই ছোট আমি। তবে ও সব সময়ে সহযোগিতা করত। আলোচনা করে মঞ্চে উঠত। এমন দিলদরিয়া মানুষ সত্যিই আজ আছে বলে মনে হয় না। খোলা মনে থাকতে ভালবাসত ও। তাই হয়তো বম্বেতে ওর ভাল লাগত না। ওর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, ‘কেন বম্বেতে থাকো না?’ জ়ুবিন বলেছিল, ‘আমার বম্বে ভাল লাগে না। অসমে তো আমি রাজার মতো থাকি।’ তখন ওর কথা শুনে মনে হয়েছিল, একটু হয়তো বাড়াবাড়ি করছে। কিন্তু পরে দেখলাম, ও ঠিকই বলেছিল। সত্যিই তো ও অসমের রাজাই ছিল। ও অসমের রাজা হয়েই থাকবে।