শারদীয়ার ‘ফ্যাট টু ফিট’ রুটিন, চেহারার গড়ন সুন্দর হবে ৭ ব্যায়ামে, যে কোনও সাজেই হবেন মোহময়ী

সারাবছর খাওয়াদাওয়ায় তেমন সংযম থাকে না ঠিকই, কিন্তু পুজোর বাদ্যি বাজতেই রোগা হওয়ার তাগিদটা যেন হঠাৎ করেই চাগাড় দিয়ে ওঠে। কারণটাও খুব স্পষ্ট— উৎসবের দিনগুলিতে যে কোনও পোশাকে নিজেকে আকর্ষণীয়....

সারাবছর খাওয়াদাওয়ায় তেমন সংযম থাকে না ঠিকই, কিন্তু পুজোর বাদ্যি বাজতেই রোগা হওয়ার তাগিদটা যেন হঠাৎ করেই চাগাড় দিয়ে ওঠে। কারণটাও খুব স্পষ্ট— উৎসবের দিনগুলিতে যে কোনও পোশাকে নিজেকে আকর্ষণীয় ও মোহময়ী করে তোলার ইচ্ছে কার না থাকে! তবে এই শেষ মুহূর্তে হুট করে জিমে ভর্তি হয়ে কসরত শুরু করা খুব একটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আচমকা অত্যাধিক শারীরিক পরিশ্রমে মেদ তো ঝরবেই না, উল্টে ক্লান্তি আর পেশির মারাত্মক ব্যথায় পুজোর আনন্দটাই মাটি হতে পারে। তার চেয়ে বরং ঘরে বসেই শরীরকে সঠিক ছন্দে ফিরিয়ে আনা সম্ভব, যদি জানা থাকে সঠিক পদ্ধতি। অল্প সময়ে ক্লান্তি ব্যতিরেকে নিজেকে ফিট ও ছিপছিপে করে তুলতে কিছু সহজ কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর রুটিনই হতে পারে আপনার সেরা হাতিয়ার।

রোগা হওয়ার সহজ মন্ত্র

হাই-ইনটেনসিটি ইন্টারভ্যাল ট্রেনিং (এইচআইআইটি)

শরীরকে নিক্তির মাপে আনতে গেলে যে ধরনের ব্যায়াম করতে হয়, তার মধ্যে গোড়াতেই আসবে হাই-ইনটেনসিটি ইন্টারভ্যাল ট্রেনিংয়ের কথা। ফিটনেস প্রশিক্ষক অনুপ আচার্যের কথায়, শরীর ফিট রাখা, পেশিগঠন, স্থূলতা কমানো, সবই হতে পারে এই ধরনের ব্যায়ামে। তবে পেশাদারের পরামর্শ নিয়ে করতে হবে। হাই-ইন্টেনসিটি এক্সারসাইজ়ের ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে গতি এবং ওজন বৃদ্ধি করতে হবে। হঠাৎ করে অনেকটা স্ট্রেচ করবেন না।

মাউন্টেন ক্লাইম্বিং: অনেকটা পাহাড়ে চড়ার মতোই। প্রথমে প্লাঙ্কের ভঙ্গিতে ম্যাটের উপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ুন। এ বার একটি হাঁটু ভাঁজ করে বুকের কাছে নিয়ে আসুন। আবার আগের জায়গায় নিয়ে যান। একই ভাবে অন্য হাঁটুও ভাঁজ করে বুকের কাছে নিয়ে আসুন। এ বার ধীরে ধীরে গতি বৃদ্ধির চেষ্টা করুন। প্রথমে ১০ বার, পরে ৩০ বার পর্যন্ত এই ব্যায়াম করতে পারেন।

জাম্প স্কোয়াট: এটি করতে হলে আগে বেসিক স্কোয়াট করে নিতে হবে। দু’টি পা অল্প ফাঁক করে সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে। এ বার চেয়ারে বসার মতো ভঙ্গি করতে হবে। সেখান থেকে লাফিয়ে সোজা হতে হবে। দুই হাত মাথার উপর তুলতে হবে। পায়ের পাতায় ভর দিয়ে নেমে আবার বসার মতো ভঙ্গি করতে হবে।

উপকারিতা:

১) সাধারণ ব্যায়ামের তুলনায় প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ বেশি ক্যালোরি খরচ হয়।২) জগিং বা ওয়েট লিফটিংয়ের চেয়ে এই শারীরচর্চায় বিপাক হার অনেকটাই বেশি হয়। ৩) দ্রুত ওজন কমে, পেশির জোর বাড়ে।৪) হার্ট ও ফুসফুস ভাল থাকে।

কারা করবেন না: হৃদ্‌রোগের সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ, আর্থ্রাইটিস বা শরীরে অস্ত্রোপচার হলে এই ব্যায়াম না করাই ভাল।

বার্পি

বার্পি এক ধরনের টোনিং এক্সারসাইজ়। শরীরের গড়ন সুন্দর করার জন্য করা হয়। শরীরের উপরের অংশ অর্থাৎ আপার টরসো এবং নীচের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বা লোয়ার লিম্বের জোর বৃদ্ধির জন্য এই ব্যায়াম উপকারী। বার্পি সঠিক নিয়মে করলে সাইকেল চালানো বা দৌড়োনোর চেয়েও তাড়াতাড়ি মেদ ঝরে।

বেসিক বার্পি: প্রথমে সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে। এর পর স্কোয়াট ভঙ্গিতে, অর্থাৎ চেয়ারে অর্ধেকটা বসার মতো ভঙ্গি করতে হবে। তার পর দুই হাতের তালু মাটিতে রাখতে হবে। সেই ভঙ্গিতে থেকেই দুই পা মুড়ে প্লাঙ্কের মতো ভঙ্গি করুন। তার পর সেই অবস্থা থেকেই পা সামনে টেনে লাফিয়ে উঠে দাঁড়ান।

ওয়াকিং বার্পি: পদ্ধতি বেসিক বার্পির মতোই। যাঁরা লাফাতে পারবেন না, তাঁরা প্লাঙ্কের ভঙ্গিতে যাওয়ার পরে আগে বাঁ পা সামনে আনবেন, ডান পা পিছনে থাকবে। তার পর ১০ সেকেন্ড থেকে ডান পা সামনে আনতে হবে। সেই সময়ে বাঁ পা পিছনে থাকবে। এই ভাবে ২০ বার করতে হবে।

উপকারিতা:

১) পেশির জোর বাড়ে।২) শরীরের গড়ন সুন্দর হয়।৩) যে কোনও বয়সেই করা যায় এই ব্যায়াম।

৪) একই সঙ্গে কার্ডিয়ো ও স্ট্রেংথ ট্রেনিংয়ের উপকার পাওয়া যায়।

কারা করবেন না: হাঁটুর ব্যথা, স্লিপ ডিস্ক, উচ্চ রক্তচাপ থাকলে করা যাবে না।

ডেড-হ্যাং

শধু রড ধরে ঝুলতে হবে। তাতেই ওজন কমবে হুড়মুড়িয়ে। জটিল সব অসুখবিসুখ দূর হবে। ব্যায়ামের এই পদ্ধতি পুরনো, তবে নতুন করে তা আলোচনায়। কমবয়সিদের কাছে এখন ফিটনেসের নয়া মন্ত্র এখন ‘ডেড হ্যাং’।

পদ্ধতি: লোহার রড বা স্টিলের বার দু’হাতে শক্ত করে ধরে ঝুলে থাকতে হবে। এ ধরনের ব্যায়ামে আলাদা করে ওজন তোলার প্রয়োজন হয় না, বিশেষ কোনও যন্ত্রপাতিও লাগে না। শরীরের নিজস্ব ওজনকেই ব্যবহার করা হয়। এমন ভাবে রডটি সেট করতে হবে, যাতে ঝুলে থাকার সময় ভেঙে না যায়। ব্যায়ামটি করার সময়ে একটি টুল বা চেয়ার রাখতে হবে। তার পর উচ্চতা অনুযায়ী রডটি সেট করতে হবে। টুলে উঠে দুই হাত দিয়ে আগে রডটি শক্ত করে ধরতে হবে। দুই হাতের মধ্যে ব্যবধান থাকবে। তার পর টুল থেকে পা সরিয়ে শরীর ঝুলিয়ে দিতে হবে। এই অবস্থায় শরীরকে স্থির ও শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখতে হবে।

উপকারিতা:

১) ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘাম না ঝরিয়েও ওজন কমবে।২) পেট-কোমর, নিতম্বের মেদ ঝরবে।৩) শরীরের ঊর্ধ্বাংশের পেশির ব্যায়াম হবে।

কারা করবেন না: কাঁধে ব্যথা, হাতে অস্ত্রোপচার হয়েছে, স্লিপ ডিস্কের সমস্যা বা ভার্টিগো থাকলে এই ব্যায়াম করা যাবে না।

পিলাটেজ়

পিলাটেজ় শরীরচর্চার এমন এক পদ্ধতি, যা যন্ত্রপাতি ছাড়াই করা যায়। এই ব্যায়ামে কার্ডিয়ো, স্ট্রেংথ ট্রেনিংয়ের মতোই উপকার পাওয়া যায়, আবার যোগাসনের মতো নানা ভাবে শরীরের স্ট্রেচিংও হয়। কম পরিশ্রমে আরাম করে ওজন কমাতে হলে পিলাটেজ় বেছে নিতে পারেন।দ্য হান্ড্রেড: ম্যাটের উপর চিত হয়ে শুয়ে পড়তে হবে আগে। দুই হাত থাকবে শরীরের দুই পাশে। এ বার দুই পা ৪৫ ডিগ্রি কোণে উঁচুতে তুলতে হবে। একই সঙ্গে মাথা ও কাঁধ ম্যাট থেকে সামান্য উপরে তুলতে হবে। শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক রেখে দুই হাত শরীরের দু’পাশে ক্রমাগত উপরে তুলতে হবে ও নামাতে হবে।

সোয়ান ডাইভ: মেরুদণ্ডের নমনীয়তা বাড়াতে এবং পিঠের পেশি মজবুত করতে এটি অত্যন্ত কার্যকর। উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ুন। দুই হাতের তালু মেঝেতে রাখুন। এ বার শ্বাস নিতে নিতে মাথা থেকে কোমর অবধি উপরের দিকে তুলুন। মাটি থেকে অন্তত ৮ ইঞ্চি তোলার চেষ্টা করতে হবে। দুই পা পিছনের দিকে অন্তত ৪৫ ডিগ্রি কোণে তোলার চেষ্টা করতে হবে। এর পর দুই হাত শরীরের দু’পাশে ছড়িয়ে দিতে হবে। পেটের উপর শরীরের ভারসাম্য থাকবে।

কারা করবেন না: স্লিপ ডিস্ক, ফ্রোজ়েন শোল্ডার, স্পন্ডিলোসিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের ব্যথা থাকলে প্রশিক্ষকের পরামর্শ ছাড়া করা যাবে না।

যোগব্যায়াম

যন্ত্রপাতি নিয়ে ব্যায়াম পছন্দ না হলে যোগব্যায়াম করাই শ্রেয়। যোগাসন সবক্ষেত্রেই নিরাপদ, সঠিক পদ্ধতিতে করতে পারলে শরীরের গড়ন সুন্দর হবে, পেশির জোর বাড়বে, রোগপ্রতিরোধ শক্তিও বাড়বে।

পদ্ধতি: দিনের শুরুটা সূর্য নমস্কার দিয়ে করতে পারেন। ১২টি আসনের পদ্ধতি আছে। এর পর একে একে ত্রিকোণাসন, ভুজঙ্গাসন, স্কন্ধ চক্রাসন, গ্রীবা প্রসারণ অভ্যাস করতে পারেন। শরীর নমনীয় হলে ধনুরাসন, হলাসন, চক্রাসনের মতো আসন অভ্যাসে উপকার বেশি হবে।

উপকারিতা:

১) সারা শরীরে রক্তসঞ্চালন ভাল হবে।

২) ব্যথাবেদনা কমবে, পেশির জোর বৃদ্ধি পাবে।

৩) পেট-কোমর, নিতম্ব, ঊরুর মেদ কমবে।

৪) মন ভাল থাকবে।

রেজ়িস্ট্যান্স ট্রেনিং

রেজ়িস্ট্যান্স ব্যান্ড নিয়ে ব্যায়াম করলে খুব দ্রুত ওজন কমে। পেশির জোর বাড়ে। বডি টোনিং করার যে সব ব্যায়াম আছে, সেগুলির মধ্যে রেজ়িস্ট্যান্স ব্যান্ড নিয়ে ব্যায়াম করা সহজ।

রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ড বাইসেপ কার্ল: ব্যান্ডের মাঝখানের অংশটি দুই পায়ের নীচে চেপে সোজা হয়ে দাঁড়ান। এ বার ব্যান্ডের দুই প্রান্ত দুই হাত দিয়ে শক্ত করে ধরুন। কনুই শরীরের সঙ্গে ঠেকিয়ে রেখে ব্যান্ডের প্রান্ত দুটিকে টেনে কাঁধের দিকে তুলুন এবং আস্তে আস্তে নামান।

ইলাস্টিক ব্যান্ড রোয়িং: একটি রেজ়িস্ট্যান্স ব্যান্ড শক্ত কিছুর সঙ্গে আটকে দু’হাত দিয়ে পিছন দিকে টানতে হবে। এটি পিঠ, কাঁধ ও হাতের পেশি মজবুত করে। নিয়মিত করলে ফুসফুসের ব্যায়ামও হয়। শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করবে এই ব্যায়াম।

কারা করবেন না: হৃদ্‌রোগ থাকলে, ডায়াবিটিস জনিত চোখের অসুখ থাকলে বা উচ্চ রক্তচাপ থাকলে প্রশিক্ষকের পরামর্শ ছাড়া করা যাবে না।

স্ট্রেচিং

শরীর ফিট থাকার অন্যতম উপায় হল স্ট্রেচিং। হরেক রকমের স্ট্রেচিং রয়েছে। তবে তা করার আগে জেনে নিতে হবে, কোন ধরনের স্ট্রেচিং আপনার জন্য উপকারী।

পদ্ধতি: প্রথমে করুন আর্ম সার্কল। হাত কাঁধ বরবার সোজা রেখে প্রথমে ঘড়ির কাঁটার দিকে ও পরে ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে ১০ বার করে ঘোরান।

এর পরে শোল্ডার সার্কল। সোজা দাঁড়িয়ে কাঁধকে ১০ বার ঘড়ির কাঁটার দিকে ও ১০ বার ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে ঘোরান।

রোটেশনাল নেক এক্সারসাইজ় করুন। সোজা দাঁড়িয়ে বা বসে মাথা ডান দিকে ও বাঁ দিকে ঘোরান ১০ বার। মাথা কাঁধের কাছে নামান, ডান দিকে ও বাঁ দিকে ১০ বার।

পায়ের জন্য করতে হবে ফ্রন্ট কিক, ব্যাক কিক ও সাইড কিক ৷ কিছু ধরে সোজা দাঁড়িয়ে এক এক পায়ে ১০ বার করে করতে হবে।

উপকারিতা:

১) শরীরের নমনীয়তা বাড়বে।

২) পেশির শক্তি বাড়বে।

৩) যে কোনও বয়সেই করা যায় এই ব্যায়াম।

৪) ভারী কোনও ব্যায়াম করা আগে শরীর ‘ওয়ার্ম আপ’ করতেও স্ট্রেচিং জরুরি।